ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কিছু খেলোয়াড় রয়েছেন, যারা কেবল তাদের খেলার দক্ষতার জন্য নয়, বরং তাদের ব্যক্তিত্ব, মাঠের কৌতুকপূর্ণ আচার আচরণ এবং দর্শকদের মনে জায়গা কাটা মুহূর্তগুলোর জন্যও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। ঠিক এমন এই একজন ইংল্যান্ডের ক্রিকেট কিংবদন্তি ডেরেক উইলিয়াম র্যান্ডাল ছিলেন । তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ ফিল্ডার, ব্যাট হাতে মাঝে মাঝে জাদুকর, আর মাঠে তার প্রাণবন্ত উপস্থিতি তাকে ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে দিয়েছে। তার ক্যারিয়ার ছিল রঙিনের মতো - ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে আনন্দময়। তিনি ছিলেন 'অজাতশত্রু'। সতীর্থ, প্রতিপক্ষ, দর্শক, আম্পায়ার, কর্মকর্তা, এমনকি মাঠে উপস্থিত পুলিশকেও তিনি আপন করে নিতেন।
১৯৫১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ারের রেটফোর্ডে জন্মগ্রহণ করেন ডেরেক র্যান্ডাল। ছোটবেলায় তিনি স্কুলে খুব একটা ক্রিকেট খেলেননি। বাড়ির পিছনের বাগানে বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে খেলার মাধ্যমে তার ক্রিকেট শিক্ষা শুরু হয়। এই সাধারণ শুরু থেকেই তিনি ক্রিকেট মাঠে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। রেটফোর্ড ক্লাবের হয়ে খেলার সময় তার প্রতিভা প্রকাশ পায় এবং ১৯৭০ সালে তিনি নটিংহ্যামশায়ার দলে যোগ দেন। সে সময় দলের অধিনায়ক ছিলেন ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি স্যার গ্যারি সোবার্স। ১৯৭২ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এসেক্সের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে তিনি ৭৮ রানের একটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন, যার মধ্যে ছিল পাঁচটি বিশাল ছক্কা। এই ইনিংস তাকে দলের মধ্যে প্রাথমিক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর তিনি যুব ইংল্যান্ড দলে ডাক পান, যা তার ক্যারিয়ারের প্রথম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডেরেক র্যান্ডালের ব্যাটিং ছিল আনঅর্থডক্স এবং অনেক সময় চোখ ধাঁধানো। তার ছোটখাটো গড়ন (৫ ফুট ৮.৫ ইঞ্চি), বড় পা (১১ নম্বর সাইজ) এবং শরীরের তুলনায় লম্বা হাত তার ব্যাটিং স্টাইলকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। তিনি শুরুতে নার্ভাস থাকতেন, বিশেষ করে অফ-স্টাম্পের বাইরের বলে সমস্যায় পড়তেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, "আমার বল ছাড়ার শক্তি নেই, আর আমার দুর্বলতা অফ-স্টাম্পের বাইরে। তাই আমি জায়গা পাল্টে বোলারকে আমার শক্তির জায়গায় টেনে আনার চেষ্টা করি।" তার এই 'শাফল' এবং অপ্রত্যাশিত ভঙ্গিমা বোলারদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। ক্রিকেট ক্রিজে সামনে-পিছনে অসম্ভব নড়াচড়া করতেন। আবার তার বিরুদ্ধে এলবিডব্লিউর আবেদন হলে তিনি ঠিক যখন বল প্যাডে লেগেছিল সেই জায়গাতে স্থির হয়ে দাঁড়াতেন। ডেনিস লিলি মজার ছলে বলেছিলেন, র্যান্ডালকে আউট করা কঠিন কারণ তিনি ছিলেন একটি চলমান টার্গেট। তার ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা। তিনি এমন সব শট খেলতেন, যা অন্যরা সেই বলে বিপদে পড়তো বা কোনোমতে ডিফেন্স করত। তার টেনিস-স্টাইলের শট এবং অদ্ভুত কৌণিক ভঙ্গিমা তাকে একজন শিল্পীর মর্যাদা দিয়েছিল। তার টেস্ট ক্যারিয়ারে ৪৭ ম্যাচে ২৪৭০ রান (গড় ৩৩.৩৭) এবং সাতটি সেঞ্চুরি ছিল, যা তার ধারাবাহিকতার অভাবেরই প্রমাণ। তবে, তার সেরা দিনগুলোতে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।
ডেরেক র্যান্ডালের ফিল্ডিং ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক। কাভারে তার উপস্থিতি ছিল একটি জীবন্ত প্রদর্শনী। তার দীর্ঘ হাত-পা, চটপটে শরীর এবং নিখুঁত থ্রো তাকে ফিল্ডিংয়ে এক অনন্য নাম করে তুলেছিল। তিনি দৌড়ে এসে বল ধরতেন এবং এক মোশনে স্টাম্পে থ্রো করতেন, যা ছিল অব্যর্থ। বেশিরভাগ সময় তিনি কাভারে ফিল্ডিং করতেন। বোলার দৌড় শুরু করলে তিনিও কভারের একটু পেছন থেকে দুহাত ছড়িয়ে দৌড়াতে শুরু করতেন। তার ফিল্ডিংয়ের ক্ষমতা এতটাই অসাধারণ ছিল যে, তাকে কলিন ব্ল্যান্ড এবং নিল হার্ভি-র মতো কিংবদন্তি ফিল্ডারদের সঙ্গে তুলনা করা হতো। ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে গর্ডন গ্রিনিজকে রান আউট করে তিনি তার ফিল্ডিংয়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। তিনি বলতেন, "আমি সবসময় চটপটে ছিলাম। লম্বা হাত থাকায় সুবিধা হতো।" তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি স্টাম্প টার্গেট করে অনুশীলন করতেন, যা তার অব্যর্থ থ্রোর পেছনে কাজ করত। তার ফিল্ডিংয়ের জন্য তাকে 'আর্কল' নামে ডাকা হতো, একটি বিখ্যাত রেসহর্সের নামানুসারে, যা তার গতি এবং ক্ষিপ্রতার প্রতীক ছিল।
ডেরেক র্যান্ডালের ব্যক্তিত্ব ছিল তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাঠের মধ্যে তিনি জোরে জোরে নিজের সঙ্গে কথা বলতেন। তিনি ছিলেন একজন প্রাণবন্ত, হাস্যরসপ্রিয় এবং দুষ্টু স্বভাবের মানুষ, যিনি মাঠে এবং মাঠের বাইরে সবাইকে আনন্দ দিতেন। শরীরের তুলনায় ঢিলেঢালা পোশাক পরতেন। হাত পর্যন্ত জামা, অর্ধেকটা গুটানো। এই ধরনের পোশাকে তাকে খানিকটা ক্লাউনের মতো মনে হতো। তার ডাকনাম 'র্যাগস' এসেছিল তার পোশাক জোড়াতালি দিয়ে পরার অভ্যাস থেকে, যা তার নির্লিপ্ত এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ চরিত্রের প্রতিফলন। তিনি মাঠে কখনো পুলিশের টুপি ধার করে নকল অভিনয় করতেন, কখনো খুঁটিতে চড়ে বসতেন, আবার কখনো গ্যালারির দর্শকদের হাসাতেন তার অদ্ভুত ভঙ্গিমায়। তার এই মজাদার চরিত্র মাঠে তার সিরিয়াস খেলার সঙ্গে মিশে এক অনন্য মিশ্রণ তৈরি করত। তিনি নিজের সঙ্গে কথা বলতেন, নিজেকে তিরস্কার করতেন এবং উৎসাহ দিতেন—"চল, র্যাগস! মনোযোগ দাও! ইংল্যান্ড তোমার উপর নির্ভর করছে!" এই মনোলগ তার খেলার অংশ ছিল, কিন্তু কখনোই অশ্রাব্য বা আক্রমণাত্মক ছিল না। তার হাসিখুশি স্বভাব এবং সততা তাকে সতীর্থ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছেও প্রিয় করে তুলেছিল। তিনি কখনো বড় অর্থের পেছনে ছোটেননি, দলে দুদবছর অনিয়মিত থাকার পরও দক্ষিণ আফ্রিকার বিদ্রোহী সফরে যাননি, বা প্যাকার সার্কাসে যোগ দেননি। তিনি ছিলেন ইংল্যান্ড এবং নটিংহ্যামশায়ারের প্রতি অটল আনুগত্যে একজন সৎ পেশাদার।
১৯৭৬-৭৭ ভারত সফর: ইডেনে র্যান্ডালের টেস্ট অভিষেক হয়। ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিক সাফল্য না পেলেও তার ফিল্ডিং এবং কৌতুকপ্রিয় আচরণ দর্শকদের মন জয় করে। পুলিশের চোখের আড়ালে তিনি ঠিক কিরকম ভাবভঙ্গি করছেন সেটা দর্শকদের দেখাতেন, আবার পুলিশ যখন তার দিকে তাকাতো, তিনি উল্টো দিকে গালে আঙুল দিয়ে দার্শনিকের মতো তাকিয়ে থাকতেন। কোনো সময় আবার পুলিশের টুপি এবং বন্দুক ধার করে নকল অভিনয় করতেন, যা গ্যালারিতে হাসির ঝড় তুলত। অধিনায়ক টনি গ্রেগ তার এই আচরণকে দলের মনোবল বাড়ানো এবং ভারতীয় দর্শকদের মন জয়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন। ইংল্যান্ড সিরিজটি ৩-১-এ জিতে নেয়, এবং র্যান্ডালের মজাদার উপস্থিতি দলের সাফল্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মেলবোর্নের শতবার্ষিকী টেস্ট (১৯৭৭): ভারত সফরে ব্যর্থ হলেও টনি গ্রেগ তাকে মেলবোর্নে বিখ্যাত শতবার্ষিকী টেস্ট খেলতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই ম্যাচটি ছিল ডেরেক র্যান্ডালের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে প্রথম টেস্টের ১০০ বছর পূর্তির উদযাপন হিসেবে এই ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন রানী এলিজাবেথ, স্যার ডন ব্র্যাডম্যান এবং দুই দলের প্রায় সব প্রাক্তন কিংবদন্তি ক্রিকেটার। ম্যাচের আগের রাতে র্যান্ডাল নটিংহ্যামশায়ারের কিংবদন্তি হ্যারল্ড লারউড এবং বিল ভোস-এর সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেন, যেখানে তিনি লারউডের গল্প শুনে এতটাই মুগ্ধ হন যে পরে বলেছিলেন, "লারউড টয়লেটে গেলেও আমি পেছনে পেছনে গিয়েছিলাম যেন তার গল্প না মিস করি!"
ম্যাচে ডেনিস লিলির অবিশ্বাস্য বোলিংয়ে ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ৯৫ রানে অলআউট হয়। অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৬২ রানের বিশাল লিড নেয়। ইংল্যান্ডের সামনে ছিল ৪৬৩ রানের অসম্ভব লক্ষ্য। র্যান্ডাল ২৮/১ স্কোরে ব্যাট করতে নামেন এবং ১৭৪ রানের একটি অসাধারণ ইনিংস খেলেন। মাঠে নেমে তিনি লিলিকে বলেছিলেন, "আমার উইকেট সহজে পাবে না, তোমাকে লড়ে নিতে হবে।" লিলির বাউন্সারে মাথায় আঘাত পেয়েও তিনি হাসিমুখে খেলা চালিয়ে যান। আশ্চর্যজনকভাবে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে লিলিকে বলেন "ওখানে মেরে কিছু লাভ হবে না ভাই। ওখানে কিচ্ছু নেই।" আবার কখনো নিজেই কমেন্ট্রি চালিয়ে যেতেন - "চমৎকার বল ছিল ওটা, মিস্টার লিলি!" একটি শর্ট বলে কাঁধে আঘাত পেলে তিনি টুপি খুলে লিলিকে অভিবাদন জানান। আরেকটি বাউন্সারে মাটিতে পড়ে গিয়ে তিনি ব্যাকসমারসল্ট করে উঠে দাঁড়ান, যা দর্শকদের হাসিতে মাতিয়ে তোলে। একটি শর্ট বলকে তিনি টেনিস শটের মতো মিডউইকেটে পাঠান, যা দেখে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান পর্যন্ত মুগ্ধ হন। ম্যাচের একটি বিশেষ মুহূর্ত ছিল যখন আম্পায়ার তাকে ক্যাচ আউট দিলেও, উইকেটকিপার রডনি মার্শ 'বাম্প ক্যাচ' বলে তাকে ফিরিয়ে আনেন। ১৭৪ রানে আউট হয়ে দর্শকদের অভিবাদন নিতে নিতে ফেরার সময় তিনি গেট ভুল করে অন্যদিকে ঢুকে পড়েন। গিয়ে দেখেন যেখানে দ্বিতীয় রানী এলিজাবেথ বসে আছেন সেখানে পৌঁছে গেছেন। রানী তাকে সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দেন। পরে র্যান্ডাল বলেছিলেন, "আমি মাঠের বাইরের লাল কার্পেট দেখে ভেবেছিলাম আমার ইনিংসের সম্মান জানানোর জন্য রাখা আছে।" এই ম্যাচে তার কৌতুকপ্রিয় আচরণ এবং সাহসী ব্যাটিং একত্রে তাকে একজন কিংবদন্তি করে তুলেছিল। ইংল্যান্ড ম্যাচটি ৪৫ রানে হারলেও, র্যান্ডালের ইনিংসটি ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তিনি 'ম্যান অব দ্য ম্যাচ' পুরস্কার জিতে নেন। সেখানেও এক মিনিটের বক্তৃতার শেষে তিনি বলে দেন "লিলিকে ধন্যবাদ এই (মাথার) দাগটা রেখে যাওয়ার জন্য।"
১৯৭৭ সালের অ্যাশেজ সিরিজ: নটিংহামে নিজের মাঠে প্রথম টেস্ট খেলতে নামেন। তখন তিনি নিজেদের দর্শকদের কাছে শতবার্ষিকী টেস্টের জন্য বড় হিরো। তিন বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন কাটিয়ে জিওফ বয়কট ওই ম্যাচে প্রথম ফিরেছিলেন। ইনিংসের শুরুর দিকেই বয়কট বোলার থমসন-এর কাছে বল গেলেও রানের জন্য ছুটে বেরিয়ে যান। র্যান্ডাল বয়কটকে বাঁচানোর জন্য নন-স্ট্রাইকার এন্ড থেকে বেরিয়ে গিয়ে রান আউট হলে দর্শকদের রাগ গিয়ে পড়ে বয়কটের ওপর। বয়কট টুপিতে মুখ আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে বলেছিলেন--"আমার অবস্থা ছিল 'ধরণী দ্বিধা হও’র মতো।”। র্যান্ডাল তার স্বভাবসিদ্ধ কৌতুক ভঙ্গিতে দর্শকদের শান্ত করেন। ম্যাচ শেষে একটা শতরান এবং ৮০ রানের ইনিংস খেলে বয়কট যখন ইংল্যান্ডকে জিতিয়ে দেন তখন র্যান্ডালের উক্তি ছিল "আমি জানতাম তো এই ম্যাচটা ওই জেতাতে পারে, সেই জন্যই তো আমি বেরিয়ে গিয়ে রান আউট হয়েছিলাম।"
আরেকবার তিনি অদ্ভুতভাবে রান আউট হয়েছিলেন। ক্রাইস্টচার্চে বল করতে এসে চ্যাটফিল্ড দাঁড়িয়ে যান। র্যান্ডাল তখন ক্রিজের ভেতরে। তিনি চ্যাটফিল্ডকে বলে ওঠেন, "তুমি কি ভেবেছ এইরকমভাবে আমি বেরিয়ে যাব" বলে ব্যাটটা তোলেন, চ্যাটফিল্ড অখেলোয়াড়োচিত মনোভাব দেখিয়ে সেই সময় বেল ফেলে দেন।
অ্যাশেজ সিরিজের পরের ম্যাচ হেডিংলিতে ইংল্যান্ডের জয়ে র্যান্ডালের ফিল্ডিং এবং কৌতুকপূর্ণ আচরণ ছিল অবিস্মরণীয়। তিনি কাভারে তার বিখ্যাত 'হ্যান্ডস্প্রিং' উদযাপন করেন, যা ক্রিকেট ইতিহাসে একটি আইকনিক মুহূর্ত। তার ক্ষিপ্রতা এবং প্রতিক্রিয়া তাকে ফিল্ডিংয়ে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল। তিনি মাঠে ঢিলেঢালা ভঙ্গিতে দাঁড়ালেও, বলের প্রতি তার মনোযোগ ছিল অতুলনীয়। এই ম্যাচে তার ফিল্ডিং দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এবং তার হ্যান্ডস্প্রিং দর্শকদের মনে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে।
১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে মেলবোর্নে অ্যাশেজ সিরিজের চতুর্থ টেস্টে র্যান্ডালের ১৫০ রানের ইনিংস ছিল তার ক্যারিয়ারের আরেকটি মাইলফলক। ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ১৪২ রানে পিছিয়ে ছিল, এবং দ্বিতীয় ইনিংসে টপ অর্ডার ধসে পড়ে। জিওফ বয়কট প্রথম বলেই আউট হন, এবং ইয়ান বোথাম, ডেভিড গাওয়ার এবং বব উইলিস অসুস্থ বা চোটে জর্জরিত ছিলেন। এই সংকটের মুহূর্তে র্যান্ডাল তার ২ পাউন্ড ৭ আউন্সের ব্যাট হাতে নিয়ে জোরে বলে ওঠেন, "চল, র্যাগস, ইংল্যান্ড তোকে চাইছে।" প্রায় দশ ঘণ্টা উইকেটে থেকে তিনি ১৫০ রানের একটি অসাধারণ ইনিংস খেলেন, প্রচণ্ড গরমে অস্ট্রেলিয়ার সেরা বোলারদের বিরুদ্ধে। সারাক্ষণ তিনি নিজের সঙ্গে জোরে জোরে কথা বলতেন এবং উৎসাহ দিতেন—"মনোযোগ দে র্যাগস! মনোযোগ দে আহাম্মক! ইংল্যান্ড তোর উপর নির্ভর করছে!" এই ইনিংসটি ছিল অ্যাশেজের ইতিহাসে সবচেয়ে ধীরগতির সেঞ্চুরি, কিন্তু তার ধৈর্য এবং মনোবল ইংল্যান্ডকে ৯৩ রানে জয় এনে দেয়। এই ম্যাচে তার কৌতুকপ্রিয় মনোযোগ এবং মাঠের প্রাণবন্ত উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। তিনি আরেকটি 'ম্যান অব দ্য ম্যাচ' পুরস্কার জিতে নেন। লো-স্কোরিং সিরিজে ইংল্যান্ডের ৫-১ জয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৮৫ রান করে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন।
ক্রিকেটার র্যান্ডালের ক্যারিয়ার ছিল উত্থান-পতনের মিশ্রণ। ১৯৭৮-৭৯ অ্যাশেজ সিরিজে তিনি ব্রিসবেনে ৭৫ এবং ৭৪* রানের ইনিংস খেলে ম্যাচ জিতিয়ে দেন। ১৯৮১ সালে ভারতের বিরুদ্ধে লর্ডসে ১২৬ রান এবং ওভালে ৯৫ রানের ইনিংস খেলেন। নিউজিল্যান্ড সফরে তিনি ইয়ান বোথামের সঙ্গে জুটি গড়ে তিনটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন—ট্রেন্ট ব্রিজে ৮৩, ওয়েলিংটনে ১৬৪ এবং অকল্যান্ডে ১০৪। এটি ছিল তার শেষ টেস্ট সেঞ্চুরি। কিন্তু ১৯৮৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে জোয়েল গার্নার-এর বলে দুই ইনিংসে ০ এবং ১ রানে আউট হওয়ার পর তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আর কখনো ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেননি।
অবসরের পর র্যান্ডাল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেডফোর্ড স্কুলে কোচিং করান। তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন অ্যালাস্টার কুক, যাকে তিনি ECB ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিতে সুপারিশ করেছিলেন। নটিংহ্যামশায়ার তার সম্মানে ট্রেন্ট ব্রিজে 'ডেরেক র্যান্ডাল স্যুট' নামে একটি গ্যালারি নামকরণ করে।
ডেরেক র্যান্ডাল শুধুমাত্র একজন ক্রিকেটার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিনোদনকারী। তার খেলায় পেশাদারিত্বের পাশাপাশি ছিল প্রাণবন্ততা, যা দর্শকদের মুগ্ধ করত। তার মজাদার চরিত্র, অক্লান্ত ফিল্ডিং এবং স্মরণীয় সব ঘটনা তাকে ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অন্যরকম মর্যাদা দিয়েছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, খেলার মাঠে জয়-পরাজয়ের বাইরেও কিছু বিষয় থাকে, যা দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন